জীব কোষের ভেতর লুকিয়ে আছে মহাবিশ্ব




জকে আমরা একটা জার্নিতে যাব। যার গন্তব্য এতই ছোট যে খালি চোখে দেখা যায় না, কিন্তু সেই ছোট্ট জগৎটার ভেতর এত রহস্য লুকানো যে মহাবিশ্বকেও হার মানায়। আজ আমরা কথা বলব সেই জীব কোষের বৈজ্ঞানিক রহস্য নিয়ে।

আমাদের এই শরীরটা ভাবুন। এই যে আপনি বসে এই লেখা পড়ছেন, আপনার হাত নড়ছে, চোখের পাতা ফেলছে, এই সবকিছুর পেছনে কাজ করছে কয়েক ট্রিলিয়ন ছোট ছোট কারখানা। প্রতিটা কারখানা এতটাই নিপুণ, এতটাই জটিল যে পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তিও এখনো তার সব রহস্য পুরোপুরি উন্মোচন করতে পারেনি। শুনতে অবিশ্বাস্য লাগছে? চলুন, তাহলে শুরু করা যাক।

একটা সাধারণ প্রাণীকোষের কথা চিন্তা করুন। এটাকে আপনি একটা প্রকান্ড শহর হিসেবে কল্পনা করুন। চারপাশে আছে একটা সীমান্তপ্রাচীর—কোষঝিল্লি। কিন্তু এই প্রাচীর কিন্তু সাধারণ ইট-পাথরের তৈরি না। এটা অতীব বুদ্ধিমান একটা ফটকওয়ালা দেয়াল। এটা ঠিক করে দেয় কে ভেতরে ঢুকবে, কে বের হবে। আয়ন, গ্লুকোজ, অ্যামিনো অ্যাসিড—প্রত্যেকের জন্যই আলাদা ফটক। শহরের নিরাপত্তা রক্ষা করাই এর কাজ।

শহরের ভেতরে ঢুকলেই দেখবেন একটা অদ্ভুত ব্যাপার। পুরো শহর জুড়ে একটা জেলির মতো পদার্থ ভরা, যাকে বলে সাইটোপ্লাজম। এই জেলির ভেতরেই ভেসে বেড়াচ্ছে শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর, যাদের বলে অর্গানেল।

এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর হলো নিউক্লিয়াস বা কেন্দ্রক। এটাকে বলা হয় কোষের মস্তিষ্ক। কিন্তু কেন? কারণ এখানেই রাখা আছে আমাদের সব গোপন নকশা ডিএনএ (DNA)।

এখন আসুন সবচেয়ে বড় রহস্যটার দিকে। ডিএনএ। একটা মানবকোষের ভেতরের ডিএনএ যদি খুলে টান টান করে সোজা করে দেওয়া যায়, তাহলে তার দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ২ মিটার। আর এই ২ মিটার সুতো জট পাকিয়ে আছে একটা অণুবীক্ষণিক কেন্দ্রকের ভেতর, যার ব্যাস মাপতে গেলে মাইক্রোমিটার একক ব্যবহার করতে হয়। ভাবুন তো, কী অবিশ্বাস্য প্যাকিং!

কিন্তু এই প্যাকিংই শেষ কথা না। এই সুতোর ওপর লেখা আছে এক অদ্ভুত ভাষায় জীবনের পুরো প্রোগ্রাম। চারটি মাত্র অক্ষর A, T, G, C। এই চার অক্ষর দিয়েই লেখা আছে আপনার চোখের রং কী হবে, আপনার হৃদপিণ্ড কীভাবে স্পন্দিত হবে, আপনার মস্তিষ্ক কতটা জটিল হবে—সব কিছু।

একটা মজার ব্যাপার হলো, এই পুরো স্ক্রিপ্টের একটা বিশাল অংশ আপাতদৃষ্টিতে অর্থহীন। বিজ্ঞানীরা একে বলে "জাঙ্ক ডিএনএ"। কিন্তু সত্যি কি এগুলো জাঙ্ক? নাকি আমরা এখনও সেই ভাষার ব্যাকরণ বুঝতে শিখিনি? সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, এই জাঙ্ক ডিএনএ-ই হয়তো জিনগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখে, ঠিক কখন কোন জিন কাজ করবে, সেটা নির্ধারণ করে। পুরোনো ধাঁচের চাবির তালার মতো করে নয়, বরং একটা জটিল সিম্ফনির কন্ডাক্টরের মতো।

কোষের ভেতরে আরেকটা অর্গানেল আছে, যার নাম মাইটোকন্ড্রিয়া। এদের ডাকনাম "কোষের পাওয়ার হাউস"। এরা আমাদের খাবার থেকে শক্তি তৈরি করে, যা ছাড়া আমরা এক মুহূর্তও বাঁচতে পারব না। কিন্তু এদের নিয়ে সবচেয়ে রোমাঞ্চকর রহস্যটা কী জানেন?

বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, বহু কোটি বছর আগে মাইটোকন্ড্রিয়া ছিল একটা স্বাধীন ব্যাকটেরিয়া। সে ছিল শক্তি উৎপাদনে ওস্তাদ। একদিন এক বিশালাকার আদি কোষ (Archaean) এই ছোট ব্যাকটেরিয়াটাকে গিলে ফেলল। কিন্তু হজম করার বদলে, একটা অদ্ভুত জোট বাঁধল। ছোট ব্যাকটেরিয়াটা বড় কোষটার ভেতরেই থেকে গেল। বিনিময়ে সে শক্তি জোগাতে লাগল, আর বড় কোষটা তাকে নিরাপদ আশ্রয় দিল।

এই সম্পর্ক এতটাই গভীর হলো যে, এখন মাইটোকন্ড্রিয়া নিজেরা আর আলাদা করে বাঁচতে পারে না। তাদের নিজস্ব ডিএনএ আছে, যা কোষের মূল ডিএনএ থেকে আলাদা। আর সেটা অনেকটাই ব্যাকটেরিয়ার ডিএনএ-র মতো। এই এন্ডোসিম্বায়োটিক তত্ত্ব আজ বিজ্ঞানের অন্যতম মজার ও রোমাঞ্চকর গল্প।

ভাবুন এবার, আপনার শরীরের প্রতিটি কোষের ভেতরে বাস করছে এক একটা প্রাচীন ব্যাকটেরিয়ার বংশধর, যে আপনার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে!

আমাদের শরীরের কয়েক ট্রিলিয়ন কোষ কি এলোমেলোভাবে কাজ করে? মোটেও না। তারা সব সময় কথা বলছে, যোগাযোগ করছে। এই যোগাযোগের মাধ্যম কী? কোষগুলো নানা রকম রাসায়নিক বার্তাবাহক, যেমন হরমোন নিঃসরণ করে। প্রতিবেশী কোষ বা দূরের কোনো টিস্যুর কোষ এই বার্তা গ্রহণ করে। কোষঝিল্লির ওপর থাকে অসংখ্য রিসেপ্টর প্রোটিন। এরা হলো নির্দিষ্ট তালার মতো। যখন সঠিক চাবি (রাসায়নিক বার্তা) এসে তালার সাথে মেলে, তখনি কোষের ভেতরে এক সিগন্যালের সৃষ্টি হয়।

এই সিগন্যাল শুরু হয়, আর তখনি শুরু হয় এক বিস্ময়কর খেলা। প্রোটিনের ওপর প্রোটিন কাজ করে, একের পর এক ক্যাসকেড তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত সেই বার্তা পৌঁছে যায় নিউক্লিয়াসে। নিউক্লিয়াস তখন নির্দেশ দেয়, "এই জিনটা অন কর", অথবা "ওই প্রোটিনটা বানানো বন্ধ কর"।

এই পুরো প্রক্রিয়াটা এত জটিল, এত নির্ভুল যে কল্পনা করা কঠিন। একটু এদিক-ওদিক হলেই দেখা দিতে পারে ক্যান্সারের মতো ভয়ংকর রোগ, যেখানে কোষ আর শরীরের কথা শোনে না, শুধু নিজের ইচ্ছায় বাড়তে থাকে।

সবশেষে আসা যাক সবচেয়ে রহস্যময় আর একটু ভয়ংকর ব্যাপারটায়। অ্যাপোপটোসিস। আমাদের শরীরের কিছু কিছু কোষ যখন বুঝতে পারে যে তারা আর ঠিকমতো কাজ করছে না, অথবা তারা অন্যের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে, তখন তারা একটা আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।

এটা কোনো বিশৃঙ্খল মৃত্যু নয়। এটা এক চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়া। কোষ নিজেকে ছোট ছোট টুকরো করে ফেলে, আর প্রতিবেশী কোষ বা ম্যাক্রোফেজ নামক "আবর্জনাকারী" কোষ এসে সেই টুকরোগুলো পরিষ্কার করে ফেলে, চারপাশে কোনো বিশৃঙ্খলা না তৈরি করে।

ভাবুন, ব্যাঙাচি যখন ব্যাঙে পরিণত হয়, তখন তার লেজটা অদৃশ্য হয়ে যায় কীভাবে? এই প্রোগ্রামড ডেথের কারণেই। আমাদের হাতের আঙুলগুলো গঠনের সময় আঙুলের মাঝের জালগুলো এই আত্মহত্যার কারণেই মুছে যায় কোষের এত গভীর আত্মত্যাগের ক্ষমতা! নিজের অস্তিত্ব শেষ করে দিয়ে সে সুস্থ রাখে গোটা শরীরকে।

আমরা কোষের দরজায় শুধু উঁকি মেরে দেখলাম। ভেতরের গহীন অন্ধকারে আরও কত রহস্য যে লুকানো আছে! আমরা এখনো জানি না, কীভাবে একটা মাত্র নিষিক্ত ডিম থেকে এত রকমের টিস্যু, অঙ্গ তৈরি হয়। আমরা জানি না, স্মৃতি আসলে কীভাবে সংরক্ষিত হয় এই কোষের জালে। আমরা জানি না, বার্ধক্যকে ঠেকানোর চাবিকাঠি কি কোষের ভেতরেই লুকানো আছে?

প্রতিটি কোষ যেন এক একটা মহাবিশ্ব। আর সেখানে এখনও অজানা, অনাবিষ্কৃত হয়ে আছে অসংখ্য রহস্য। এই রহস্যই বিজ্ঞানকে চালিত করে, আর আমাদের মনে কৌতূহলের আগুন জ্বালিয়ে রাখে।

আপনার শরীরের প্রতিটি কোষ আজ এই মুহূর্তে অক্লান্ত পরিশ্রম করছে আপনার জন্য। তাদের এই নিরবচ্ছিন্ন, বিস্ময়কর কর্মযজ্ঞের সামনে আমরা নতজানু হতে বাধ্য। প্রকৃতির এই কারিগরি আর সৌন্দর্যের কাছে বারবার মন ভরে যায় অবাক হওয়ার মতো বিষয়ে।

#cellbiology #microcosmos #ScienceWonder  #genetics #ScienceEducation

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

হরি দল ও অক্ষরজ্ঞানহীন দরিদ্র কৃষক হরিপদ কাপালী

"বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল"

ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়ার চিকিৎসায় অগ্রগতি - আত্মহত্যার রোগ