আমরা একটি বিরাট Giant Void এর ভিতর আছি
আমাদের মহাবিশ্ব যে বিরাট এক রহস্যে ঘেরা, তার আরেকটি সংযোজন সাম্প্রতিক এক বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব। বিজ্ঞানীরা বলছেন, আমাদের পৃথিবী, সৌরজগত, এমনকি আমাদের ছায়াপথ মিল্কিওয়ে হয়তো মহাকাশের এক বিরাট শূন্যতার বা Giant Void ভেতরে আটকে আছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিক জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং মহাবিশ্ববিদ এই তত্ত্বের পক্ষে মত দিয়েছেন, যা মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে আমূল বদলে দেওয়ার মতো।
এই তত্ত্বটি মূলত Hubble Tension নামক এক কঠিন সমস্যার সমাধান হিসেবে এসেছে। ১৯২৯ সালে এডউইন হাবল আবিষ্কার করেন যে মহাবিশ্ব ক্রমাগত প্রসারিত হচ্ছে। কিন্তু সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, আমাদের কাছাকাছি মহাবিশ্ব যে হারে প্রসারিত হচ্ছে (হাবল ধ্রুবক), দূরবর্তী প্রাচীন মহাবিশ্বের প্রসারণের হার তার থেকে অনেক ধীর। বিজ্ঞানীরা এই অমিলকে 'হাবল টেনশন' বলে অভিহিত করেন। একে ব্যাখ্যা করার জন্যই সামনে আসে Void Theory।
পোর্টসমাউথ ও সেন্ট অ্যান্ড্রুস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা সম্প্রতি দাবি করেছেন যে আমাদের স্থানীয় অঞ্চলটি মহাবিশ্বের গড় ঘনত্বের চেয়ে প্রায় ২০% কম ঘনত্ববিশিষ্ট একটি বিশাল শূন্য অঞ্চলে অবস্থিত। এই শূন্যতার ব্যাস প্রায় ২০ বিলিয়ন আলোকবর্ষ। এর নাম দেওয়া হয়েছে Hubble Bubble। মহাবিশ্ব একটি বিশাল স্পঞ্জের মতো, যেখানে কিছু অংশ ঘন, কিছু অংশ ছিদ্রযুক্ত। আমরা আছি সেই ছিদ্রের ভেতরে।
এই তত্ত্বের মূল যুক্তি হলো- ঘনত্বের পার্থক্য। যেকোনো বস্তু যেমন ঘন অংশ থেকে পাতলা অংশের দিকে ধাবিত হয়, ঠিক তেমনি মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কারণে আমাদের শূন্যতার চারপাশের ঘন পদার্থগুলি কেন্দ্র থেকে বাইরের দিকে টান সৃষ্টি করছে। এর ফলে আমাদের শূন্যস্থানটি আরও ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। যখন আমরা এই ফাঁকা জায়গা থেকে দূরবর্তী ছায়াপথগুলোর দিকে তাকাই, তখন তাদের আলো আমাদের কাছে যেভাবে আসে, তাতে মনে হয় তারা খুব দ্রুত দূরে সরে যাচ্ছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটা স্রেফ একটি অপটিক্যাল ইলিউশন। কারণ, শূন্যতার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসার সময় আলো কিছুটা পরিবর্তিত হয়, যা আমাদেরকে প্রসারণের হার নিয়ে ভুল ধারণা দেয়।
গবেষকরা তাদের তত্ত্বকে সমর্থন করতে ব্যারিয়ন অ্যাকোস্টিক অসিলেশন (BAO) নামক প্রাচীন শব্দ তরঙ্গের তথ্য ব্যবহার করেছেন। তারা দেখিয়েছেন, শূন্যতাবিহীন একটি মহাবিশ্বের তুলনায় এই শূন্যতা-মডেলটির সত্যি হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ১০০ মিলিয়ন গুণ বেশি।
যদি এই তত্ত্ব সত্যি হয়, তাহলে এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। প্রথমত, আমাদের ডার্ক এনার্জি এবং ডার্ক ম্যাটার সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাগুলো পুনর্বিবেচনা করতে হবে। ডার্ক এনার্জি যে সমানভাবে সব জায়গায় কাজ করছে, এটি তার বিপরীতে ইঙ্গিত করে। দ্বিতীয়ত, মহাবিশ্বের প্রসারণের হার এখন আর 'একক' নয়; এটি মহাকাশের অবস্থানভেদে পরিবর্তিত হতে পারে। তৃতীয়ত, বিগ ব্যাং তত্ত্ব এবং মহাবিশ্বের বয়স নিয়ে আমাদের হিসাবেও পরিবর্তন আসতে পারে, কারণ মহাবিশ্বের বয়স প্রসারণের হারের ওপর নির্ভরশীল।
তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, এটি এখনও একটি তত্ত্বমাত্র। এর পক্ষে পর্যাপ্ত পর্যবেক্ষণমূলক প্রমাণ এখনও সংগ্রহ করা হয়নি। জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপসহ আরও উন্নত যন্ত্রের সাহায্যে ভবিষ্যতে এই শূন্যতার প্রকৃত অস্তিত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন, হাবল টেনশনের আরও সহজ কোনো সমাধান থাকতে পারে, যেমন আমাদের পরিমাপ পদ্ধতিতে কোনো ত্রুটি।
শেষ পর্যন্ত, এই বিরাট শূন্যতা তত্ত্ব আমাদের মহাবিশ্বকে দেখার চোখকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল। এটি প্রমাণ করল যে আমরা যতই জানি, তার চেয়ে অনেক বেশি অজানা রয়েছে। হয়তো আমাদের পুরো ছায়াপথটি মহাবিশ্বের এক বিশাল ফাঁকা প্রান্তরে ভেসে বেড়াচ্ছে, আর তা থেকেই আমরা মহাবিশ্বের নতুন সব হিসাব-নিকাশ করতে শিখছি। যেমনটি প্রখ্যাত বিজ্ঞানী কার্ল সেগান বলেছিলেন: "আমরা যদি তারাদের দিকে তাকাই, তাহলে আমরা ইতিহাসের দিকে তাকাই" আর এই ইতিহাস হয়তো এখনও লেখা বাকি।
Collected
#voids #theory #astrophysics #SpaceExploration
মন্তব্যসমূহ