আমরা সবাই কোথায় ছুটে চলছি!


আমরা জানি পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। চাঁদ পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, আমাদের এই বিশাল নক্ষত্রপুঞ্জ, আমাদের এই মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি আসলে কাকে কেন্দ্র করে ঘুরছে? এর গন্তব্য কোথায়?

শুরুতে একদম বেসিক জায়গা থেকে শুরু করা যাক। আমরা ছোটবেলা থেকেই পড়ে আসছি, পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘোরে। পৃথিবী সেকেন্ডে প্রায় ৩০ কিলোমিটার গতিতে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে। কিন্তু সূর্য নিজেও কিন্তু স্থির হয়ে বসে নেই। আমাদের সূর্য, তার পুরো পরিবার অর্থাৎ পৃথিবী, মঙ্গল, বৃহস্পতিসহ সব গ্রহকে নিয়ে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রকে প্রদক্ষিণ করছে। এখন প্রশ্ন হলো, মিল্কিওয়ের কেন্দ্রে কী আছে? কী এমন শক্তিশালী জিনিস যা কোটি কোটি নক্ষত্রকে নিজের মায়ার বাঁধনে আটকে রেখেছে?

উত্তরটা হলো, একটি সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল, যার নাম Sagittarius A*। এটি আমাদের সূর্যের ভরের চেয়ে প্রায় ৪০ লক্ষ গুণ বেশি ভারী! হ্যাঁ, সূর্যের অভিকর্ষ বলই পৃথিবীকে ধরে রেখেছে, আর এই ব্ল্যাক হোলটি সূর্যের চেয়ে ৪০ লক্ষ গুণ ভারী! এর অকল্পনীয় মহাকর্ষীয় টানের কারণেই আমাদের গ্যালাক্সির স্পাইরাল আর্ম বা বাহুগুলো টিকে আছে।

আমাদের সৌরজগৎ এই ব্ল্যাক হোলকে কেন্দ্র করে ঘণ্টায় প্রায় ৮ লক্ষ ২৮ হাজার কিলোমিটার গতিতে ছুটছে। এত বিশাল গতিতে ছোটার পরেও, গ্যালাক্সির কেন্দ্রকে একবার ঘুরে আসতে সূর্যের সময় লাগে প্রায় ২৩ কোটি বছর!

হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। ২৩ কোটি বছর। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় এক গ্যালাকটিক ইয়ার। শেষবার যখন আমাদের সৌরজগৎ গ্যালাক্সির ঠিক এই পজিশনে ছিল, তখন পৃথিবীতে ডাইনোসরদের রাজত্ব সবে শুরু হচ্ছিল। আর এখন যখন আমরা আবার সেই জায়গায় এসেছি, তখন পৃথিবীতে মানুষের সভ্যতা গড়ে উঠেছে।

তাহলে মিল্কিওয়ে কি শুধুই নিজের লাটিমের মতো ঘুরছে? নাকি সে নিজেও কোথাও ছুটে চলেছে?

মহাবিশ্বে কোনো কিছুই একা থাকে না। যেমন মানুষ সমাজে বাস করে, নক্ষত্ররা গ্যালাক্সিতে বাস করে, তেমনি গ্যালাক্সিরাও দল বেঁধে থাকে। আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি একা নয়, এটি একটি গ্যালাক্সি পাড়ার সদস্য। এই পাড়া বা ক্লাস্টারের নাম হলো দ্য লোকাল গ্রুপ।

এই লোকাল গ্রুপে প্রায় ৫৪টিরও বেশি গ্যালাক্সি আছে। এদের মধ্যে সবথেকে বড় এবং প্রভাবশালী দুটি গ্যালাক্সি হলো আমাদের মিল্কিওয়ে এবং আমাদের প্রতিবেশী অ্যান্ড্রোমিডা।

এতদিন আমরা জানতাম মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে, সবকিছু একে অপরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। কিন্তু লোকাল গ্রুপের চিত্রটা একটু ভিন্ন। এখানে অভিকর্ষ বল বা গ্র্যাভিটি এতটাই শক্তিশালী যে, এটি মহাবিশ্বের প্রসারণকে হারিয়ে দিচ্ছে। আমাদের মিল্কিওয়ে এবং অ্যান্ড্রোমিডা একে অপরকে প্রচণ্ড শক্তিতে কাছে টানছে। আমরা বর্তমানে ঘণ্টায় প্রায় ৪ লক্ষ ২ হাজার কিলোমিটার গতিতে অ্যান্ড্রোমিডার দিকে ছুটে যাচ্ছি।

বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, আজ থেকে প্রায় ৪৫০ কোটি বছর পর, এই দুই গ্যালাক্সির মধ্যে এক মহাজাগতিক সংঘর্ষ হবে। তখন আর মিল্কিওয়ে বা অ্যান্ড্রোমিডা আলাদা থাকবে না। দুটি মিলে তৈরি হবে এক নতুন বিশাল ইলিপটিক্যাল গ্যালাক্সি, যার নাম বিজ্ঞানীরা মজা করে দিয়েছেন "মিল্কোমিডা" বা Milkomeda।

তাহলে আমরা এখন পর্যন্ত কী জানলাম?
১. পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘোরে।
২. সূর্য গ্যালাক্সির কেন্দ্রের ব্ল্যাক হোলের চারিদিকে ঘোরে।
৩. পুরো মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি অ্যান্ড্রোমিডার দিকে ছুটে যাচ্ছে।

কিন্তু দাঁড়ান, এই পুরো লোকাল গ্রুপ বা গ্যালাক্সির পাড়াটাও কি স্থির? নাকি এরা সবাই মিলে আরও বড় কিছুর দিকে ধাবিত হচ্ছে?

এখন আমরা রহস্যের সবথেকে ইন্টারেস্টিং অংশে প্রবেশ করছি। আমাদের লোকাল গ্রুপ, অর্থাৎ মিল্কিওয়ে, অ্যান্ড্রোমিডা এবং বাকি ৫২টি গ্যালাক্সি সবাই মিলে ঘণ্টায় প্রায় ২২ লক্ষ কিলোমিটার গতিতে মহাকাশের একটি নির্দিষ্ট দিকে ছুটে চলেছে। কিন্তু কোথায়? এবং কেন?

১৯৭০-এর দশকে বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেন, আমাদের গ্যালাক্সি এবং আশেপাশের হাজার হাজার গ্যালাক্সি একটি নির্দিষ্ট বিন্দুর দিকে অদ্ভুতভাবে আকৃষ্ট হচ্ছে। এই জায়গাটি আমাদের থেকে প্রায় ১৫০ থেকে ২৫০ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। বিজ্ঞানীরা এর নাম দেন দ্য গ্রেট অ্যাট্রাক্টর।

এটি কোনো সাধারণ ব্ল্যাক হোল নয়। এটি ভরের এমন এক বিশাল সমাবেশ, যা আমাদের কল্পনার বাইরে। কিন্তু সমস্যা হলো, আমরা একে সরাসরি দেখতে পাই না। কারণ এটি আমাদের গ্যালাক্সির "জোন অফ এভয়েডেন্স"  বা ধুলোবালির আড়ালে লুকিয়ে আছে।

২০১৪ সালে হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিজ্ঞানী মহাবিশ্বের ম্যাপ তৈরি করতে গিয়ে এক যুগান্তকারী আবিষ্কার করেন। তারা দেখেন, আমাদের লোকাল গ্রুপ, ভার্গো ক্লাস্টার এবং গ্রেট অ্যাট্রাক্টর এরা সবাই আসলে আরও বিশাল একটি সুপারক্লাস্টারের অংশ। এই বিশাল কাঠামোর নাম দেওয়া হয় "লানিয়াকিয়া"। হাওয়াইয়ান ভাষায় যার অর্থ অসীম স্বর্গ।

লানিয়াকিয়া সুপারক্লাস্টারে প্রায় ১ লক্ষ গ্যালাক্সি রয়েছে। আর এই পুরো কাঠামোটি দেখতে একটি বিশাল ঝরনা বা নদীর মতো, যেখানে মহাকর্ষের টানে গ্যালাক্সিগুলো একটি কেন্দ্রের দিকে প্রবাহিত হচ্ছে।

অর্থাৎ, সহজ কথায় বলতে গেলে আমরা লানিয়াকিয়া নামক এক বিশাল মহাজাগতিক মহাদেশের ছোট্ট এক গ্রামের বাসিন্দা। আর আমরা সবাই মিলে সেই মহাদেশের রাজধানীর দিকে অর্থাৎ গ্রেট অ্যাট্রাক্টরের দিকে ভেসে যাচ্ছি।

কিন্তু টুইস্ট এখনো বাকি! বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি দেখেছেন, শুধু গ্রেট অ্যাট্রাক্টরই আমাদের টানছে না, বরং আমাদের উল্টো দিকে একটি বিশাল ফাঁকা জায়গা বা Dipole Repeller আমাদের ঠেলে দিচ্ছে। অর্থাৎ, পেছন থেকে ধাক্কা এবং সামনে থেকে টান এই দুইয়ের প্রভাবে আমরা মহাকাশে এক অবিশ্বাস্য গতিতে ছুটে চলেছি।

আমরা মনে করি আমরা স্থির হয়ে বসে আছি। আমাদের অফিস, স্কুল, ঘরবাড়ি সবকিছু স্থির। কিন্তু বাস্তবে আমরা এক বিশাল মহাজাগতিক রোলার কোস্টারে চড়ে বসে আছি।

সূর্য আমাদের নিয়ে যাচ্ছে গ্যালাক্সির চারপাশে, গ্যালাক্সি আমাদের নিয়ে যাচ্ছে অ্যান্ড্রোমিডার কাছে, আর আমরা সবাই মিলে ভেসে যাচ্ছি লানিয়াকিয়ার বিশাল সমুদ্রে। আমরা মহাবিশ্বের এই বিশালতার কাছে ধূলিকণার চেয়েও ক্ষুদ্র। কিন্তু আমাদের কৌতূহল এই মহাবিশ্বের মতোই অসীম।

💡 Collected 

#milkyway #galaxy #spaceexploration #SpaceMysteries

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

হরি দল ও অক্ষরজ্ঞানহীন দরিদ্র কৃষক হরিপদ কাপালী

"বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল"

ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়ার চিকিৎসায় অগ্রগতি - আত্মহত্যার রোগ