স্ট্রিং থিওরির ১১ মাত্রা: আমাদের চোখে অদৃশ্য মহাবিশ্বের দরজা


রা যাক আপনার সামনে একটি সরু বৈদ্যুতিক তার টানটান করে বাঁধা আছে। দূর থেকে তাকালে তারটি আপনাকে কেবল একটি সরল রেখা মনে হবে, যা একটি মাত্র দিকে প্রসারিত। কিন্তু এবার কল্পনা করুন সেই তারের উপর একটি ক্ষুদ্র পিঁপড়ে হাঁটছে (এই পোস্টের সাথে দেওয়া ছবিটি একবার দেখে নিন)। আমাদের চোখে যে তারটি শুধু সামনে পেছনে প্রসারিত একটি রেখা, পিঁপড়েটির কাছে সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগৎ। কারণ সে শুধু সামনে পেছনে হাঁটতে পারে না, চাইলে সে তারটির চারপাশেও ঘুরেও যেতে পারে। অর্থাৎ আমাদের কাছে যে জিনিসটি একমাত্রিক মনে হয়, তার কাছে সেখানে আরও একটি লুকানো দিক আছে। এই ছোট উদাহরণটি ব্যবহার করেই আধুনিক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের একটি গভীর ধারণা বোঝা যায়, সম্ভবত আমাদের মহাবিশ্বেও এমন কিছু মাত্রা রয়েছে, যেগুলো আমরা সরাসরি দেখতে পাই না।

আমরা সাধারণত মনে করি মহাবিশ্বের তিনটি স্থানিক মাত্রা আছে— দৈর্ঘ্য, প্রস্থ এবং উচ্চতা। এর সাথে যুক্ত হয় সময়, যা আমাদের বাস্তবতাকে চার মাত্রিক করে তোলে। এই ধারণাটিই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল Albert Einstein-এর বিখ্যাত General Relativity তত্ত্বে, যেখানে বলা হয় মহাবিশ্ব আসলে একটি চারমাত্রিক কাঠামো, বা স্পেসটাইম। কিন্তু যখন পদার্থবিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের ক্ষুদ্রতম স্তরে প্রকৃতির আচরণ বোঝার চেষ্টা করতে গেলেন, তখন দেখা গেল এই চার মাত্রা যথেষ্ট নয়।

এখানেই প্রবেশ করে String Theory, একটি আলোচিত তত্ত্ব যা বলছে মহাবিশ্বের মৌলিক কণাগুলো বিন্দু নয়, বরং অবিশ্বাস্যভাবে ক্ষুদ্র কম্পনশীল স্ট্রিং বা সূতা। ঠিক যেমন একটি গিটারের তার ভিন্নভাবে কম্পিত হলে ভিন্ন সুর তৈরি হয়, তেমনি এই স্ট্রিংগুলোর ভিন্ন কম্পন থেকেই সৃষ্টি হতে পারে বিভিন্ন কণা যেমন Electron বা Photon। কিন্তু এই তত্ত্বের গাণিতিক সমীকরণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে পদার্থবিদরা একটি অদ্ভুত সমস্যার মুখোমুখি হন। সমীকরণগুলো ঠিকভাবে কাজ করতে হলে মহাবিশ্বে কেবল তিনটি নয়, বরং আরও অনেক মাত্রা থাকতে হয়।

প্রথম দিকের স্ট্রিং থিওরির মডেলগুলো দেখায় যে মহাবিশ্বে মোট ১০টি মাত্রা থাকা দরকার। পরে এই ধারণা আরও বিস্তৃত হয়ে পৌঁছায় M-Theory-এ, যেখানে বলা হয় মহাবিশ্বে মোট ১১টি মাত্রা থাকতে পারে। প্রশ্ন উঠতেই পারে: "যদি সত্যিই এতগুলো মাত্রা থাকে, তাহলে আমরা সেগুলো দেখি না কেন?"

এখানেই আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা “কমপ্যাক্টিফিকেশন”। ধারণাটি হলো, এই অতিরিক্ত মাত্রাগুলো এতটাই ক্ষুদ্র এবং ভাঁজ হয়ে আছে যে আমরা দৈনন্দিন জীবনে সেগুলো অনুভব করতে পারি না।

উদাহরণ হিসেবে একটি কাগজের পাতাকে কল্পনা করুন। দূর থেকে দেখলে এটি একটি সরল রেখার মতো মনে হতে পারে, কিন্তু কাছে গেলে বোঝা যায় এর প্রস্থও আছে। ঠিক তেমনি মহাবিশ্বের অতিরিক্ত মাত্রাগুলো অত্যন্ত ক্ষুদ্র স্কেলে নিজেদের মধ্যে গুটিয়ে রয়েছে যার আকার প্রায় Planck Length মাত্রার কাছাকাছি।

আরেকটি উদাহরণ ভাবুন। একটি বাগানের পাইপ দূর থেকে দেখলে আপনাকে একটি সরল রেখা মনে হবে। কিন্তু যদি আপনি খুব কাছ থেকে তাকান, দেখবেন পাইপের চারপাশে একটি গোলাকার দিক রয়েছে। ছোট কোনো পোকা সেই পাইপের চারপাশে ঘুরে বেড়াতে পারে, যদিও দূর থেকে আমরা সেই মাত্রাটি দেখতে পাই না। স্ট্রিং থিওরি বলছে, আমাদের মহাবিশ্বেও হয়তো ঠিক এমন লুকানো মাত্রা রয়েছে যেগুলো এত ক্ষুদ্র যে আমরা কেবল তাদের প্রভাব অনুভব করতে পারি, সরাসরি দেখতে পারি না।

এই অতিরিক্ত মাত্রাগুলো শুধু একটি গাণিতিক কৌতূহল নয়; এগুলো মহাবিশ্বের গভীর রহস্যের সাথে যুক্ত। অনেক পদার্থবিদ মনে করেন, প্রকৃতির বিভিন্ন শক্তি এবং কণার বৈশিষ্ট্য আসলে নির্ধারিত হয় এই লুকানো মাত্রাগুলোর জ্যামিতির মাধ্যমে। অর্থাৎ অতিরিক্ত মাত্রাগুলো কীভাবে ভাঁজ হয়ে আছে, তার উপর নির্ভর করতে পারে কোন কণা কীভাবে আচরণ করবে, কিংবা কোন শক্তি কতটা শক্তিশালী হবে।

এই ধারণাটি এক আশ্চর্য দৃষ্টিভঙ্গি দেয়। আমরা যে মহাবিশ্ব দেখি যেমন নক্ষত্র, গ্যালাক্সি, আলো এবং পদার্থে ভরা এগুলো সম্ভবত এটি সম্পূর্ণ বাস্তবতার কেবল একটি ক্ষুদ্র অংশ। এর পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে আরও বহু মাত্রার এক বিশাল কাঠামো, যেখানে আমাদের চোখে অদৃশ্য জ্যামিতি নির্ধারণ করছে পুরো কসমসের নিয়ম।

তবে একটি সত্য এখনো রয়ে গেছে, এই অতিরিক্ত মাত্রাগুলো এখনো সরাসরি প্রমাণিত হয়নি। এগুলো স্ট্রিং থিওরির গাণিতিক কাঠামো থেকে উঠে আসা একটি সম্ভাবনা। কিন্তু যদি ভবিষ্যতে কোনোভাবে প্রমাণ পাওয়া যায় যে মহাবিশ্ব সত্যিই ১১ মাত্রার, তাহলে আমাদের বাস্তবতার ধারণা সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে। তখন আমরা হয়তো আবিষ্কার করব আমাদের পরিচিত তিন মাত্রার জগত আসলে এক বিশাল বহুমাত্রিক মহাবিশ্বের একটি ক্ষুদ্র জানালা মাত্র।

হয়ত সেই অদৃশ্য মাত্রাগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় রহস্য, যে রহস্য এখনো আমাদের চোখের সামনে থেকেও অদৃশ্য।

➡️ উল্লেখ: লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার (LHC) এর মতো শক্তিশালী যন্ত্রে অতি-উচ্চ শক্তিতে কণা সংঘর্ষ ঘটিয়ে এই লুকানো মাত্রাগুলোর অস্তিত্ব খোঁজার চেষ্টা চালাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। রিলেটেড দুটি এক্সপেরিমেন্ট নিয়ে ভিডিও আছে দেখতে পারেন। 

(সংগ্রহীত)

#dimensions ​#StringTheory #theoreticalphysics #quantummechanics #UniverseMysteries

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

হরি দল ও অক্ষরজ্ঞানহীন দরিদ্র কৃষক হরিপদ কাপালী

"বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল"

ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়ার চিকিৎসায় অগ্রগতি - আত্মহত্যার রোগ